কিছু দিন আগে একটা ট্রল ভাইরাল হয়েছিল। “এখানে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা গান ডাউনলোড দেয়া হয়!” এই ট্রল দেখে সবার হাঁসি পেলেও, আমার কান্না পাইছে। এর কারন হচ্ছে, আমি এমন অনেক কম্পিউটার সাইন্স স্টুডেন্ট কে চিনি যারা, সিএসই এর ৩য়-৪র্থ ইয়ার শেষ করে ফেল্লেও, কম্পিউটার এ গান ডাউনলোড করতে পারে না।

সিএসই ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা গান ডাউনলোড করা হয় এবং ঢাকার রাস্তায় ঢিল ছুড়ে মারলে সিএসই স্টুডেন্ট এর গায়ে পড়বে  গালিব নোটস
সিএসই ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা গান ডাউনলোড করা হয় এবং ঢাকার রাস্তায় ঢিল ছুড়ে মারলে সিএসই স্টুডেন্ট এর গায়ে পড়বে – গালিব নোটস

সিএসই স্টুডেন্ট নিয়ে আরেকটি ট্রল চোখে পড়ে। সেটা হচ্ছে, ঢাকা শহরে যদি আপনি কোন ঢিল ছুড়ে মারেন, তাহলে সেটি হয় সিএসই স্টুডেন্ট এর গায়ের উপর পড়বে না হয় বিবিএ স্টুডেন্ট এর গায়ের উপর পড়বে। তাহলে, চিন্তা করে দেখুন, শুধু মাত্র ঢাকা তে কি পরিমান সিএসই স্টুডেন্ট রয়েছে!

যারা সিএসই পড়ছেন কিছু না বুঝে, তাড়া বাদ দিয়ী দেন না কেন! – গালিব নোটস

এত এত স্টুডেন্ট দের জন্য আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার নেই। কবি বলেছেন, তাদের জন্য ১ বালতি আফসোস! কিন্তু আমি বলব, ১ বালতি আফসোস মনে হয় একটু কম ই হয়ে যাবে।

সিএসই স্টুডেন্ট এর কমন কিছু ডায়লগ হচ্ছে, আমার প্রোগ্রামিং ভালো লাগে না! আমি হতাশ! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যাদের প্রোগ্রামিং ভালো লাগে না, যারা কম্পিউটার এর সামনে বসে থাকতে চায় না, তাদের সিএসই তে ভর্তী হতে বলেছে কে?

বাংলাদেশ এ যত গুলো কম্পিউটার আছে, তার থেকে বেশি সিএসই স্টুডেন্ট আছে - গালিব নোটস
বাংলাদেশ এ যত গুলো কম্পিউটার আছে, তার থেকে বেশি সিএসই স্টুডেন্ট আছে – গালিব নোটস

সিএসই বাদ দিয়ে দিলেই তো হয়। অন্য ডিপার্টমেন্ট এ গেলে সমস্যা কি? অন্য অনেক ডিপার্টমেন্ট আছে। সেখানে গিয়ে ক্রিয়েটিভিট দেখালেই তো হয়। সমস্যা সমাধান হয়ে যায়।

সিএসই এর যারা একদম শেষ দিকে আছেন কিন্তু এখনো বলে যাচ্ছেন এগুলা, ল্যাব ভালো লাগে না, পারি না, আমাকে দিয়ে হবে না! যারা এ ধরনের লেইম এক্সকিউজ দেখান, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আপনারা কি একবারও নিজেদের চিন্তা করেন না? এই যে ফ্যামিলি থেকে এত গুলো টাকা নিয়ে স্টাডি করছেন, এতে যে টাকা গুলো নষ্ট হচ্ছে, এটা আপনাদের গায়ে লাগে না? বাদ দিয়ে দিন না।

যে ৭ ধাপে একজন সিএসই শিক্ষার্থীর পতন ঘটে!

অন্য ডিপার্টমেন্ট এ গেলে সেটা আপনার নিজের জন্য যেমন ভালো হবে, সেটা ফ্যামিলির জন্য ভালো হবে। এবং সেটা দেশের জন্যও ভালো হবে। আমাদের ৪৭% গ্রাজুয়েট বেকার যাদের মধ্য একটা বড় অংশ হচ্ছে কম্পিউটার সাইন্স গ্রাজুয়েট।

তারা হচ্ছেন, ঐ শ্রেনীর গ্রাজুয়েট যারা গ্রাজুয়েশন শেষ করে ফেলছেন কিন্ত কম্পিউটার এ গান ডাউনলোড করতে পারেন না। কবি বলেছেন, তাদের জন্য ১ বালতি আফসোস! কিন্তু আমি বলব, ১ বালতি আফসোস মনে হয় একটু কম ই হয়ে যাবে। বাদ দেন ভাই এগুলা! অনেক হইছে!


কম্পিউটার সাইন্স এ ৩ ধরনের স্টুডেন্ট ক্যাটাগরি দেখা যায়।

১ । ফ্রাস্ট্রেটেড স্টুডেন্টঃ এরা সব সময় বলে আসবে, ইন্ডাস্ট্রিতে কোন চাকরী নেই! চাকরী কী পাব!! কিন্তু রিক্রুটমেন্টরা বলেন উলটা কথা। আমার সাবেক কোম্পানিতে ১১৫ জন আবেদন কারীর থেকে ২জন ডিজাইনার হায়ার করতে ব্যার্থ হয়েছিলাম শুধু মাত্র তাদের পোর কোয়ালিটির কারনে। চিন্তা করে দেখুন কি অবস্থা তাহলে।

২। প্রজেক্ট ক্যাটাগরিঃ এই দলের শিক্ষার্থীরা সব সময় ভার্সিটি লাইফ এ প্রজেক্ট করে থাকে একটা জিনিস এর উপর। সেটা হচ্ছে, ম্যানেজমেন্ট-পয়েন্ট অফ সেল। তাদের কাছে প্রজেক্ট মানেই ম্যানেজমেন্ট-পয়েন্ট অফ সেল। এর যা করবে, যা বানাবে সব কিছুতে ম্যানেজমেন্ট-পয়েন্ট অফ সেল।

সফটয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্টার্নশিপ পেতে মাত্র ৪টি স্টেপ!

৩। আউট অফ ৪.০ সিজিঃ সিএসই তে আরও একদল শিক্ষার্থী আছে, যারা হচ্চে ৪ আউট অফ ফোর। সর্বচ্চ সিজি ধারী এই ভদ্রলোক গুলো দুনিয়া উলটে গেলেও, স্লাইড, বই মুখুস্ত করে ৪ তুলবে। এরা জীবনে কিছু বুঝবার চেষ্টাও করবে না।

পৃথিবীতে সম্ভবত বাংলাদেশ ই একমাত্র দেশ, যেখানে কম্পিউটার সাইন্স এর মত একটা সাবজেক, কিছু না বুঝেও গ্রাজুয়েট হওয়া যায়। শুধু মুখুস্ত করে সর্বচ্চ রেজাল্ট করা যায়। ১লাইন কোড না লিখেও ফ্যাকাল্টি হওয়া যায়!

কি ভয়াবহ অবস্থা চিন্তা করতে পারেন? একজন ফ্যাকাল্টি, যিনি সব সাবজেক্ট এ ৪ এ ৪ পেয়েছেন সব সেমিস্টার এ। কিন্তু উনার সব প্রজেক্ট করে দিয়েছেন অন্য কেউ! যিনি নিজেই কিছু বুঝেন না, তিনি যখন ফ্যাকাল্টি হয়, তখন শুধু স্লাইড এর বাইরে কি আর পড়াতে পারেন?


আমাদের ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে যে সব বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে, সব গুলোর প্রথম ডিপার্টমেন্ট হচ্ছে সিএসই। এর জন্যই সিএসই তে এত ক্রাউড। কেউ বুঝুক আর না বুঝুক, সিএসই তে গনহাড়ে ভর্তী হচ্ছে।

যারা কম্পিউটার সাইন্স এ রানিং স্টুডেন্ট তাদের জন্য ৪টি পড়ামর্শঃ

১(এক)। ভালো লাগুক বা না লাগুক, চোখ-মুখ বন্ধ করে ৬মাস-১বছর প্রোগ্রামিং এর চেষ্টা করবেন। রেগুলার ট্রাই করবেন, মেডিসিন খাওয়ার মত। আশা করা যায়, বেশীরভাগ হেলে মেয়ের এতে করে, কোড লেখা ভালো লাগবে। কমফোর্ট জোনের বাইরে নিজেকে নিয়ে যাবেন, বিভিন্ন ডিফারেন্ট প্রজেক্ট এ ইনভল্ভ হবেন।

আগে তো চেষ্টা করতে হবে। না হলে, পইয়াশন গ্রো করবে কি ভাবে আর আগ্রহ আছে কি না, সেটা বুঝবেন কিভাবে? ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যান। সফলতা আসবেই।

২(দুই)। শুধু পাশ করার জন্য নয়, স্টাডি করুন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য। একাডেমিক বই ছাড়াও, সাবজেক ওয়াইজ রেফারেন্স বই পড়বেন। কোর্স এর প্রজেক্ট গুলোতে নিজে হাতে কোড লিখবেন।

বেকার ফ্রিল্যান্সার হচ্ছেন না তো? নতুন ফ্রিল্যান্সারদের ৯৯ ভাগ বেকার!

৩(তিন)। ইন্ডাস্ট্রি ওরিয়েন্টেড চিন্তা করবেন। যদি চাকরী করতে চান, তাহলে ব্যাবসায়িক দৃষ্টি কোন থেকে চেষ্টা করবেন। কোম্পানি কি কি স্কিল চাচ্ছে, সেগুলা অরররজন করুন। আর যদি একাডেমিক লাইন এ থাকতে চান, তাহলে কিভাবে শিখানো যায়, কিভাবে ক্লাস কন্ট্রল করা যায় এগুলা শিখুন। কমিউনিকেশন শিখুন এই সময়ে।

৪(চার)। আগের তিনটি পড়ামর্শ ভালো করে মেনে চলুন।

কম্পিউটার সাইন্স অনেক ভালো এবং এক্সাইটিং একটি সাবজেক্ট। একটু মন দিয়ে লেখা পড়া করলে, একটু ট্রাই করলে সিএসই তে খুব ভালো করা সম্ভব। সিএসই এর মত এত ক্রিয়েটিভ আর ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট আর কোথাও খুজে পাবেন না।

0Shares
Asadullah

Asadullah

মোঃ আসাদুল্লাহ গালিব, পেশায় একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার এর শিক্ষার্থী আর নেশায় একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী। কম্পিউটার বিজ্ঞান এর অন্যতম ইমার্জিং এড়িয়া মেশিন লার্নিং, ড্ডিপ লার্নিং, বায়ো-ইনফরমেটিক্স নিয়ে কাজ করে থাকেন। এর বাইরে কম্পিউটার বিজ্ঞান, ক্যারিয়ার, ফ্রিল্যান্সিং এবং টেক উদ্যোগ নিয়ে লিখে থাকেন। তিনি নিজেও অনেক গুলো টেক ব্যাবসা এর সাথে সরাসরি জড়িত। গালিব নোটস মুলত ব্যাক্তিগত ব্লগ। বিল-গেটস এর ব্যাক্তিগত ওয়েব সাইট গেটস-নোটস এর নাম অনুসারে গালিব নোটস ব্লগের নাম-করন করা হয়েছে।
Close